বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ
মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, যিনি জেনারেল এম এ জি ওসমানী নামে অধিক পরিচিত। জন্মঃ জেনারেল এম এ জি ওসমানীর জন্ম ১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে জেলা। তার পৈত্রিক বাড়ি সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানার (বর্তমান ওসমানী নগর উপজেলা) দয়ামীরে গ্রামে। তার পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান এবং মাতা জোবেদা খাতুন। খান বাহাদুর মফিজুর রহমানের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট ছেলে এম এ জি ওসমানী। এম এ জি ওসমানীর জন্মের প্রাক্কালে ১৯১৮ সালে খান বাহাদুর মফিজুর রহমান তৎকালীন আসামের সুনামগঞ্জ সদর মহকুমায় সাব ডিভিশনাল অফিসার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন৷ তাদের বসবাস ছিল সুনামগঞ্জ জেলা সদরেই। এখানেই জন্ম হয় এম এ জি ওসমানীর। শিক্ষাঃ পিতার চাকরির সূত্রে তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। তাই কিছুদিন পর বদলির আদেশ নিয়ে সুনামগঞ্জ থেকে চলে যেতে হয় গোহাটিতে৷ আর সেখানেই এম এ জি ওসমানীর প্রাথমিক শিক্ষার শুরু হয়৷ ১৯২৩ সালে 'কটনস্ স্কুল অব আসাম'-এ ভর্তি হন তিনি৷ লেখাপড়ায় যে তিনি খুবই মনোযোগী ছিলেন, তার প্রমাণ হলো স্কুলের প্রত্যেক পরীক্ষায় তিনি প্রথম হতেন৷ ১৯৩২ সালে ওসমানী সিলেট গভর্নমেন্ট পাইলট হাই স্কুল এ ভর্তি হন৷ তৎকালীন সময়ে সিলেটের এই স্কুলটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল৷ ১৯৩৪ সালে সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে৷ সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন৷ এই অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ব্রিটিশ সরকার এম. এ. জি. ওসমানীকে প্রাইওটোরিয়া পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত করে। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৩৮ সালে। সেনাবাহিনীর জীবনঃ আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে এম এ জি ওসমানী তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ১৯৩৯ সালে৷ ১৯৩৯ সালে তিনি ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। দেরাদুনে ব্রিটিশ- ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কমিশন প্রাপ্ত হন। সেসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিলো। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সার্ভিস কোরের একটি ব্যাটালিয়ানে তিনি বার্মা (মিয়ানমার) সেক্টরে কাজ করেন। ১৯৪২ সালে মেজর পদে উন্নীত হন। ১৯৪২ সালে এম এ জি ওসমানী ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ মেজর।[৭] ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে এম এ জি ওসমানী ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে বিশেষ পরীক্ষা দিয়ে নিয়মিত কমিশন লাভ করেন৷ সে বছর তিনি ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল সার্ভিসের জন্যও মনোনীত হন কিন্তু তিনি সামরিক বাহিনীতেই থেকে যান৷ দেশবিভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৭ই অক্টোবর এম এ জি ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এসময় তার পদমর্যাদা ছিল লেফটেন্যান্ট কর্ণেল পদে। ১৯৪৯ সালে তিনি চিফ অফ জেনারেল স্টাফের ডেপুটি হন। ১৯৫১ সালে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর ১ম ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক নিযুক্ত হন৷ এর পর তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করেন৷ ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ববাংলার আরও কয়েকটি আঞ্চলিক স্টেশনের দায়িত্বও তিনি সফলতার সাথে পালন করেন৷ পরবর্তীকালে তিনি ১৪তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এর ৯ম ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এর অতিরিক্ত কমান্ড্যান্ট, সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ অফিসার প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি কর্ণেল পদমর্যাদা লাভ করেন এবং সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টারের জেনারেল স্টাফ অ্যান্ড মিলিটারি অপারেশনের ডেপুটি ডিরেক্টরের দায়িত্ব পান। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করেন৷ 'ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন' হিসেবে যুদ্ধরত বিভিন্ন সামরিক হেডকোয়ার্টারে যোগাযোগ করতেন তিনি৷ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ যখন শেষ হয় তখন তার বয়স চল্লিশের উপরে৷ ১৯৬৬ সালের মে মাসে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসরকালীন ছুটি নেন এবং পরের বছর (১৯৬৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি) কর্নেল পদবীতে অবসর গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক জীবন ১৯৭০ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে '৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ এলাকা থেকে পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।[৬] ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন সিলেট-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।[৮] এই ভোটে বিজয়ী হয়ে ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে ১ মে ১৯৭৪ সালে তিনি সংসদ সদস্য, মন্ত্রিত্ব এবং আওয়ামী লীগ সদস্য পদত্যাগ করেন। ২৯ আগস্ট ১৯৭৫ সালে খন্দকার মোশতাক আহমেদের মন্ত্রিসভায় তিনি অবৈতনিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতার হত্যাকান্ডে পর তিনি পদত্যাগ করেন। সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সালে এম এ জি ওসমানী “জাতীয় জনতা পার্টি” নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৮২ সালে এরশাদ সামরিক আইন জারি করলে এম এ জি ওসমানী প্রতিবাদ করেন। এরপরে তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়ান। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এম এ জি ওসমানী সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। ১১ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ভাষণ দেন৷ ঐ ভাষণে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের কথা উল্লেখ করে এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন৷[৭][১০] উল্লেখ্য যে ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি ও সরকার গঠন করা হয় এবং পরবর্তীকালে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে।[৬] ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার, এম এ জি ওসমানীকে করা হয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। এম এ জি ওসমানীর নির্দেশনা অনুযায়ী সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতিটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে একজন সেনাবাহিনীর অফিসারকে নিয়োগ দেয়া হয়। বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মাঝে সমন্বয়সাধন করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ রাখা, অস্ত্রের যোগান নিশ্চিত করা, গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা-প্রভৃতি কাজ সাফল্যের সাথে পালন করেন এম এ জি ওসমানী। ১২ এপ্রিল থেকে এম এ জি ওসমানী মন্ত্রীর সমমর্যাদায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন৷ রণনীতির কৌশল হিসেবে প্রথমেই তিনি সমগ্র বাংলাদেশকে ভৌগোলিক অবস্থা বিবেচনা করে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে নেন এবং বিচক্ষণতার সাথে সেক্টরগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন৷ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল দক্ষ এবং সংখ্যায় অনেক বেশি৷ এই বিবেচনায় এম এ জি ওসমানীর রণকৌশল ছিল প্রথমে শত্রুকে নিজেদের ছাউনিতে আটকে রাখা এবং তাদেরকে যোগাযোগের সবগুলো মাধ্যম হতে বিছিন্ন করে রাখা৷ এজন্য এম. এ. জি. ওসমানী মে মাস পর্যন্ত নিয়মিত পদ্ধতিতে যুদ্ধ পরিচালনা করেন৷ মে মাসের পর তার মনে হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কমসংখ্যক সৈন্য নিয়ে শত্রুকে ছাউনিতে আটকে রাখা গেলেও ধ্বংস করা সম্ভব নয়৷ এ বিষয়টি তিনি সরকারকে জানিয়ে যুদ্ধে কৌশলগত পরিবর্তন আনেন৷ প্রাক্তন ইপিআর এর বাঙালি সদস্য, আনসার, মোজাহেদ, পুলিশ বাহিনী ও যুবকদের নিয়ে একটি গণবাহিনী বা গেরিলাবাহিনী গঠন করেন। মুক্তির সংগ্রামে এম এ জি ওসমানীর হাতে কোনো নৌবাহিনী ছিল না। তবে নিয়মিত নৌবাহিনীর কিছু অফিসার এম এ জি ওসমানীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন৷ তাছাড়া ফ্রান্সের জলাভূমিতে থাকা পাকিস্তানের ডুবোজাহাজের কিছু সংখ্যক কর্মীও মুক্তিবাহিনীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন৷ কিছুদিন পর এম এ জি ওসমানী তাদের এবং কিছু সংখ্যক গেরিলা যুবক নিয়ে একটি নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন করেন। আগস্টের মাঝামাঝিতে তারা নদীপথে শত্রুর চলাচল প্রায় রুদ্ধ করে দেন। নৌবাহিনী গঠনের ফলে একটা বড় ধরনের সংকটের অবসান হলেও দেশ স্বাধীন হবার আগে আগে আরও একটা সঙ্কট এম এ জি ওসমানী অনুভব করেন। সেটা হচ্ছে তার হাতে কোনো বিমানবাহিনী ছিল না। শেষের দিকে দুটি হেলিকপ্টার, ও একটি অটার আর তার নিজের চলাচলের জন্য একটি ডাকোটা নিয়ে ছোট্ট একটি বিমানবাহিনী গঠন করেছিলেন তিনি৷ পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণঃ পাকিস্তানি বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এরপর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না। এম এ জি ওসমানীর অনুপস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়, “তার হেলিকপ্টারটি সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাতে পারেনি।”[১২] আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্ব ফ্রন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সৈন্যবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজী। এরা দুজনেই ছিলেন আঞ্চলিক প্রধান।[১৩] যুদ্ধ-পরবর্তী জীবনঃ ১৯৭১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চার তারকা জেনারেল পদমর্যাদা প্রদান করা হয় এবং তিনি নব দেশের প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিযুক্ত পান। ১৯৭২ সালের ১২ এপ্রিল তিনি তার এ দায়িত্ব থেকে অবসর নেন এবং মন্ত্রিসভায় যোগ দেন অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়৷ ঐ নির্বাচনে এম এ জি ওসমানী তার নিজের এলাকা থেকে অংশ নেন এবং নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করেন৷ ১৯৭৩ এর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এম এ জি ওসমানী ৯৪ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন৷ ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন। ১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে তিনি সংসদ সদস্যপদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। সেবছর ১৯৭৫ সালে ২৯ শে আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা পদে নিয়োগ পান, তবে ৩রা নভেম্বর জেলহত্যার ঘটনার পর পদত্যাগ করেন। ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এম এ জি ওসমানী 'জাতীয় জনতা পার্টি' নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের ৩রা জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনে মোট ১০জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেনঃ ১। জনাব আজিজুল ইসলাম ২। জনাব আবুল বাশার ৩। প্রিন্সিপাল এ, হামিদ (এম.এস.সি) ৪। হাকিম মাওলানা খবিরুদ্দিন আহমেদ ৫। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান (বি,ইউ, পি,এস,সি) ৬। জেনারেল (অবঃ) মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী ৭। জনাব মোঃ আব্দুস সামাদ ৮। জনাব মোঃ গোলাম মোর্শেদ ৯। শেখ মোঃ আবু বকর সিদ্দিক ১০। সৈয়দ সিরাজুল হুদা ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জেনারেল (অবঃ) এম এ জি ওসমানী অংশ নেন। তিনি জাতীয় জনতা পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি মনোনীত হয়েছিলেন, গণ ঐক্য জোট এবং ৫টি রাজনৈতিক জোটের যথাঃ জাতীয় জনতা পার্টি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় আওয়ামী পার্টি (মোজাফ্ফর), বাংলাদেশ পিপলস লীগ, গণ আজাদী লীগ। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৩৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ঐ নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। মৃত্যুঃ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার্থে লন্ডন থাকাকালীন ১৯৮৪ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি এম এ জি ওসমানী মৃত্যুবরণ করেন। তাকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটের হযরত শাহজালাল মাজারে সমাহিত করা হয়।
প্রাথমিক জীবনঃ আব্দুর-রব ১৯১৯ সালের ১ জানুয়ারী হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের অন্তর্গত খাগৌড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।[1] তাঁর পিতা স্থানীয় পঞ্চায়েতের একজন নেতা ছিলেন। তিনি তিন ভাইয়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন। তিনি স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৩৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি মুরারি চাঁদ কলেজ থেকে আই.এসসি এবং ১৯৩৯ সালে একই কলেজ থেকে ভূগোলে বি.এসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৪২ সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সামরিক জীবনঃ ১৯৪৩ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। প্রশিক্ষণ শেষে, ১৯৪৪ সালে তিনি রয়্যাল ইন্ডিয়ান আর্মি সার্ভিস কোরে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেন। ভারত বিভাজনের পর ১৯৪৭ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তিনি কোয়েটায় একটি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যাটালিয়নের অ্যাডজুট্যান্ট এবং করাচিতে সাপ্লাই মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকায় ইস্টার্ন কমান্ড স্টেশন হেডকোয়ার্টার্সের স্টাফ মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং অবশেষে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে এমবারকেশন স্টেশন কমান্ডার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন তিনি ২৪ আগস্ট ১৯৭০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধঃ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য সিলেটে মেজর চিত্তরঞ্জন দত্তের সাথে একটি বাহিনী গড়ে তোলেন। সিলেট পতনের পর তিনি অন্যদের মতো ভারতে চলে যান। ১৯৭১ সালের ১১ জুলাই তিনি মুক্তি বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ হিসেবে নিযুক্ত হন এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় তার সদর দপ্তর স্থাপন করেন। তিনি পূর্বাঞ্চলীয় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, তৎকালীন কর্নেল এম এ জি ওসমানীর সাথে সিলেট সফরকালে তাদের হেলিকপ্টারটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয় এবং তিনি আহত হন। ১৯৭২ সালে তিনি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক জীবনঃ আজীবন অবিবাহিতা তিনি ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে তিনি বানিয়াচং ও আজমিরিগঞ্জ থানা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।[3] বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরঃ সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর আবদুর রব বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। গুজব ছড়িয়েছিল যে আবদুর রবকে বীরত্ব পদক প্রদান করা হয়েছিল, যা তার ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ (সেনাবাহিনী) এ. কে. খন্দকার সুবিধাজনকভাবে নিয়ে নেন। ২০০০ সালে আবদুর রবকে মরণোত্তর স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। মৃত্যুঃ আব্দুর-রব ১৯৭৫ সালের ১৪ নভেম্বর[5] ৫৬ বছর বয়সে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি রক্তাল্পতাসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। তাঁকে হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর তীরে তাঁর গ্রাম খাগৌড়ায় দাফন করা হয়। তাঁর ছোট ভাই আব্দুর রহিম জানান যে, তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যকে পেনশন দেওয়া হয়নি। আব্দুর রবের কবর হবিগঞ্জের জেলা সদরে অবস্থিত। কিছু স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া, এমনকি দেশের জাতীয় দিবসগুলোতেও আর কাউকে সেই কবর জিয়ারত করতে যেতে দেখা যায়নি।
আবদুল মালেক (জন্ম: ২২নভেম্বর ১৯৪০- মৃত্যু: ৩রা সেপ্টেম্বর ২০১১[১]) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর প্রতীক খেতাব প্রদান করে। জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ আবদুল মালেকের জন্ম রাজশাহী জেলার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (ডাক ঘোড়ামারা) রানীনগরে। বাবার নাম আবেদ আলী এবং মায়ের নাম ফেলি বেগম। তার স্ত্রীর নাম আম্বিয়া বেগম। তাদের তিন ছেলে।মোঃ আমজাদ হোসেন,মোঃ এমদাদ হোসেন ও মোঃ এনামুল হোসেন। কর্মজীবনঃ আবদুল মালেক চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে পুনর্গঠিত হয়ে প্রথমে ৩ নম্বর সেক্টরে, পরে এস ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভোরে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সিলেট মহাসড়েকের পাশে পাইকপাড়ায়। মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি দলে বিভক্ত। সব মিলে এক ব্যাটালিয়ন শক্তির। নেতৃত্বে এ এস এম নাসিম (বীর বিক্রম)। তার নির্দেশে কিছুক্ষণ পর মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ (ব্রাভো [বি] কোম্পানি) গেল চান্দুরার এক মাইল উত্তর-পূর্ব দিকে। তাদের দায়িত্ব অগ্রসরমান মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বি দল নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান নিয়েছে। এ খবর পাওয়ার পর বাকি মুক্তিযোদ্ধারা হরষপুর-সরাইল হয়ে রওনা হলেন চান্দুরার অভিমুখে। তিনটি দল—আলফা (এ), চার্লি (সি) ও ডেল্টা (ডি) কোম্পানি। তারা দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকল। ডি দলে আছেন আবদুল মালেক। তাদের বাঁ দিকে এ ও সি দল। বেলা আনুমানিক দুইটা। ডি দল সরাইলের পথে শাহবাজপুরের কাছে পৌঁছে গেল। যুদ্ধের পরিকল্পনা অনুযায়ী ডি দল অগ্রসর হচ্ছে অন্য দুই দলের পেছনে। একদম সামনে সি দল। তাদের ওপর দায়িত্ব কৌশলে শাহবাজপুর সেতুর দখল নেওয়া। এই দলকে অণুসরণ করছে এ দল। দুই দলের মধ্যে আছে কিছুটা দূরত্ব। সবশেষে ডি দল। দলের সঙ্গে আছেন মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাটালিয়ন অধিনায়কও। এই অভিযানে বিকেলে এস ফোর্সের অধিনায়ক কে এম শফিউল্লাহমুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাসহ তার অবস্থান ডি দলের কিছুটা সামনে। তার ও ডি দলের মধ্যে ব্যবধান অল্প। ডি দলের মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যেতে থাকলেন দৃপ্ত পদভারে। তাদের সামনে কে এম শফিউল্লাহ। কোথাও তারা বাধা পাননি। বিকেলের দিকে তারা পৌঁছে গেলেন ইসলামপুরের কাছে। অদূরে চান্দুরা। এমন সময় সেখানে আকস্মিকভাবে হাজির হলো একদল পাকিস্তানি সেনা। হঠাৎ তাদের উপস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা বিভ্রান্ত। পাকিস্তানি সেনাদের এই উপস্থিতি একেবারে অনাকাঙ্ক্ষিত। আবদুল মালেকসহ মুক্তিযোদ্ধারা ভেবে পাচ্ছেন না, এটা কীভাবে ঘটল। কেননা, পেছনে আছে তাদের বি দল। তাদের ওপর দায়িত্ব অগ্রসরমান মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কে এম শফিউল্লাহ পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সেনারা সেই নির্দেশ অগ্রাহ্য করে গোলাগুলি শুরু করল। নিমেষে সেখানে শুরু হয়ে গেল তুমুল যুদ্ধ। আবদুল মালেকরা পড়ে গেলেন উভয় সংকটে। একদিকে কে এম শফিউল্লাহ পাকিস্তানি সেনাদের আওতায়, অন্যদিকে তারা ক্রসফায়ারের মধ্যে। আকস্মিকভাবে শুরু হওয়া যুদ্ধে ক্রসফায়ারে পড়ে আহত হয়েছেন তাদের অধিনায়ক এ এস এম নাসিমসহ কয়েকজন। আবদুল মালেক বিচলিত হলেন না। সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন পাকিস্তানি সেনাদের ওপর। তাকে দেখে অণুপ্রাণিত হলেন তার অন্য সহযোদ্ধারাও। এই যুদ্ধে তিনি যথেষ্ট বীরত্ব ও সাহস প্রদর্শন করেন।