সেক্টর কমান্ডার

মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের বীর কমান্ডারদের জীবনী ও অবদান

মোট 17 জন কমান্ডার
মেজর জিয়াউর রহমান বীরউত্তম

মেজর জিয়াউর রহমান বীরউত্তম

জিয়াউর রহমান (১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ – ৩০ মে ১৯৮১) ছিলেন বাংলাদেশের ৬ষ্ঠ রাষ্ট্রপতি, প্রাক্তন সেনাপ্রধান এবং বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বাঙালি জনগণের উপর আক্রমণ করার পর তিনি তার পাকিস্তানি অধিনায়ককে বন্দি করে বিদ্রোহ করেন এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরে ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার একটি বিবৃতি পাঠ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে ১৯৭৮ সালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি চার বছর বাংলাদেশ শাসন করার পর ১৯৮১ সালের ৩০শে মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে নির্মমভাবে নিহত হন। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা পরিচালিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জরিপে ২০ জন শ্রেষ্ঠ বাঙালির মধ্যে জিয়াউর রহমানের নাম ১৯ নম্বরে উঠে আসে।

মেজর এ টি এম হায়দার বীর প্রতীক

মেজর এ টি এম হায়দার বীর প্রতীক

আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার (এ টি এম হায়দার) (জন্ম:১২ জানুয়ারি, ১৯৪২ - মৃত্যু: ৭ই নভেম্বর, ১৯৭৫)ছিলেন একজন বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধা, যিনি প্রথমে দুই নং সেক্টরের সহ-অধিনায়ক ও পরে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। একজন গেরিলা কমান্ডার হিসাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অভূতপূর্ব অবদান রাখার জন্য তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন।[১] ব্যক্তিগত জীবনঃ ১৯৪২ সালের ১২ জানুয়ারি, কলকাতার ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আলহাজ মোহাম্মদ ইসরাইল। তিনি ব্রিটিশ ও পাকিস্তান পুলিশ বিভাগের ইন্সপেক্টর হিসাবে চাকুরি করতেন। মা আলহাজ হাকিমুন নেসা একজন গৃহিণী। পরিবারের দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে লে. কর্নেল হায়দার ছিলেন দ্বিতীয়। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল গ্রামে। তার বোন ডা. সিতারা বেগম, বীর প্রতীক।[২] এ.টি.এম হায়দার স্কুল জীবন শুরু করেন পাবনার বীণাপানি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে কিশোরগঞ্জ রামানন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় [বর্তমান কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়]থেকে ১৯৫৮ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এস.এস.সি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবন থেকেই হায়দার একজন ভালো খেলোয়াড়, সাতারু ও স্কাউট ছিলেন। তিনি ১৯৫৮ সালে একজন স্কাউট হিসাবে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর জাম্বুরীতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে হায়দার কিশোরগঞ্জ সরকারি গুরুদয়াল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (আই.এ) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর হায়দার উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে চলে যান। সেখানের লাহোর ইসলামিয়া কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বি.এস.সি. ডিগ্রী লাভ করেন। পরে লাহোরস্থ পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিদ্যায় ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স প্রথম পর্ব পড়াকালীন সেনাবাহিনীতে ভর্তির জন্য আবেদন করেন। এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কমিশনের জন্য মনোনীত হন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সেনাবাহিনীর ১ম কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের কর্মকর্তা হায়দার কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে পালিয়ে ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং শুরু থেকেই ২নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ এর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেলাঘরে অবস্থিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সকল মুক্তিযোদ্ধাকে কমান্ডো, বিস্ফোরক ও গেরিলা ট্রেনিং সহ হায়দার মুক্তিযোদ্ধাদের শপথ গ্রহণ করাতেন। মেলাঘরে হায়দার প্রথম একটা স্টুডেন্ট কোম্পানি গঠন করেন। এই কোম্পানিকে তিনিই ট্রেনিং প্রদান করতেন। কিশোরগঞ্জ -ময়মনসিংহ মহাসড়কের উপর তারের ঘাটপুল ও মুসল্লি রেলপুল, ঢাকা-চট্টগ্রামের রাস্তায় ফেনিতে অবস্থিত বড়পুল ধবংসসহ একাধিক অপারেশনের নেতৃত্ব দেন মেজর হায়দার। অক্টোবরের ৭ তারিখে খালেদ মোশাররফ নিয়মিত ব্রিগেড কে' ফোর্সের কমান্ড গ্রহণ করলে তিনি সেক্টর অধিনায়কত্ব লাভ করেন । ১৬ ই ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন । ঐদিন প্রথম ঢাকা বেতারে ও টিভি থেকে ঘোষণাপাঠ করেন -"আমি মেজর হায়দার বলছি -মুক্তিবাহিনীর প্রতি নির্দেশ " । গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে তাকে বীর উত্তম উপাধীতে ভুষিত করেন । কিশোরগঞ্জ জেলা]র শোলাকিয়ায়, এ.টি.এম. হায়দারের সমাধি এ.টি.এম. হায়দারের ছোট বোন ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম ও একমাত্র ছোট ভাই এ.টি.এম সফদার (জিতু) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ.টি.এম সফদার ভারতের মেলাঘরে অবস্থিত ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নেন এবং শালদানদী এলাকায় বিভিন্নযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ভারতের আগরতলাস্থ ৯২ বি. এস. এফ. ক্যাম্পের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধ বিষয়ক যোগাযোগ ও খবরাখবর (অফিসিয়াল) আদান-প্রদান করতেন। ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতালে কাজ করতেন। পাঁচশত বেডের এই হাসপাতালে তিনি একজন কমান্ডিং অফিসার হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন। হাসপাতালটি সম্পূর্ণভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত ছিল। ১৪ ডিসেম্বর তিনি সেক্টর ২ এবং এর রাজনৈতিক উপদেষ্টার, আর কে চৌধুরীর সাথে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। জনতা তাকে নিয়ে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় আনন্দিত করে, তাদের কে মাথায় তুলে। তিনি মুক্তিযুদ্ধে বীর প্রতীক খেতাব পান ।

ক্যাপ্টেন এ. এন. এম. হুদা

ক্যাপ্টেন এ. এন. এম. হুদা

মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি মেজর এম এ জলিলের নেতৃত্বে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে হিঙ্গলগঞ্জ সাব-সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মেঃ জেঃ কে এম সফিউল্লাহ বীর উত্তম

মেঃ জেঃ কে এম সফিউল্লাহ বীর উত্তম

জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ কাজী মুহাম্মদ শফিউল্লাহর জন্ম ১৯৩৪ সালের ২সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জে। তার বাবার নাম কাজী আব্দুল হামিদ এবং মায়ের নাম রজ্জব বানু। ৩ ভাই ৬ বোনের মধ্যে শফিউল্লাহ ছিলেন ৬ষ্ঠ। শফিউল্লাহ মুড়াপাড়া হাইস্কুল থেকে ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। এরপরে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার আগেই তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। কমিশন লাভ করেন ১৯৫৫ সালে। ১৯৬৮ সালে সেনা স্টাফ কলেজ (পাকিস্তান) থেকে পিএসসি পাস করেন। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯ মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঢাকা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার থেকে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব জয়দেবপুরে আসেন ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। সে সময় কে এম শফিউল্লাহ ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব ফিরে যাবার পর কে এম শফিউল্লাহর নেতৃত্বে ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ৩টি ব্যাটেলিয়ান নিয়ে জয়দেবপুর থেকে গফরগাঁও হয়ে সিলেটের তেলিয়া লাগয় মাতৃমার পর সেক্টর ও এস ফোর্স গঠন করে যুদ্ধ শুরু করেন। ২৯ মার্চ ঢাকা আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। কে এম শফিউল্লাহর নেতৃত্বে প্রথমে সেক্টর ও পরে এস ফোর্স গঠন করে প্রথমে সিলেটসহ বিরাট একটি অংশ মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলা হয়। তারা একদিকে সিলেট আর একদিকে আশুগঞ্জ, ভৈরব ও মাধবপুর শত্রুমুক্ত করেন। তার নেতৃত্বে আশুগঞ্জ, ভৈরব, লালপুর, আজবপুর, সরাইল, শাহবাজপুর, মাধবপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর শত্রুমুক্ত হয়ে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশে কর্মজীবনঃ ১৯৭১ সালে মেজর পদে মুক্তিযুদ্ধ করেন কে এম শফিউল্লাহ; যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি লেঃ কর্নেল পদে উন্নীত হন। স্বাধীনতার পরে তিনি লেঃ কর্নেল পদবীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবগঠিত ৪৬ ব্রিগেডের প্রথম কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন; ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবস কুচকাওয়াজে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সৈন্যদলের কুচাকাওয়াজের মূল নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শফিউল্লাহ, ঐ কুচকাওয়াজের প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানী। ১৯৭২ সালের ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান কে এম শফিউল্লাহকে ডেকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নিতে বলেন, তখন দেশের সামরিক বাহিনীর প্রধান অধিনায়কের দায়িত্বে জেনারেল এম এ জি ওসমানী ছিলেন। শফিউল্লাহর পদবী তখন কর্নেল ছিলো, তিনি সেনাপ্রধান হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নিতে হয়। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি ব্রিগেডিয়ার এবং একই বছরের ১০ অক্টোবর তিনি মেজর জেনারেল পদবীতে পদোন্নতি প্রাপ্ত হন, তার সঙ্গে একই দিনে জিয়াউর রহমানও মেজর জেনারেল পদবীতে পদোন্নতি পেয়েছিলেন যিনি তখন সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৪শে আগস্ট পর্যন্ত শফিউল্লাহ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়া, কানাডা, সুইডেন আর ইংল্যান্ড। ১৯৯৫ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হন। মৃত্যুঃ শফিউল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, থাইরয়েডে জটিলতা, ফ্যাটি লিভার, ডিমেনশিয়াসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় তিনি আক্রান্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন তার চলাফেরা ছিল স্ট্রেচারে। ২৬ জানুয়ারী ২০২৫ রোববার সকাল পৌনে ৯টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনি মারা যান।

উঃ কঃ এ কে খন্দকার বীর উত্তম

উঃ কঃ এ কে খন্দকার বীর উত্তম

উইং কমান্ডার আবদুল করিম খন্দকার যিনি একে খন্দকার নামে পরিচিত। জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ এ.কে. খন্দকারের জন্ম ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি। পিতার তৎকালীন কর্মস্থল রংপুর শহরে। তার বাড়ি পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার ভারেঙ্গা গ্রামে। তার পিতা খন্দকার আব্দুল লতিফ ব্রিটিশ আমলে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এবং মাতা আরেফা খাতুন ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিণী। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে এ কে খন্দকার ছিলেন তৃতীয়। পিতার চাকুরির সুবাদে তার শিক্ষা জীবনের শুরু হয় বগুড়া শহরে। তিনি সেখানে বগুড়া করোনেশন স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। তারপর পিতার বদলির কারণে তাদেরকে নওগাঁ চলে যেতে হয়। সেখানে নওগাঁ করোনেশন স্কুল (নওগাঁ জিলা স্কুল) থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল এবং মালদা জেলা স্কুলে। ভারত বিভাগের সময় এ.কে. খন্দকার ১৯৪৭ সালে মালদা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। কর্মজীবনঃ ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরে পিএএফ (পাকিস্তান বিমান বাহিনী) থেকে তিনি তার কমিশন (পাইলট অফিসার পদ) লাভ করেন। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি পাইলট অফিসার হিসেবে কাজ করেন ও পরে ফ্লাইং অফিসার হয়ে ওঠেন। তিনি পাকিস্তান এয়ার ফোর্স একাডেমীতে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন। ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর স্কুলে তিনি ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ইন্সট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে জেট ফাইটার কনভারশন স্কোয়াড্রনে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৬০ সাল পর্যন্ত। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত তিনি স্কোয়াড্রন লিডার হিসেবে কাজ করেন পিএএফ একাডেমীতে। পরে জেট ফাইটার কনভারশন স্কোয়াড্রনে তিনি স্কোয়াড্রন লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। ট্রেনিং উইং-এর অফিসার কমান্ডিং হিসেবে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি পিএএফ একাডেমীতে দায়িত্ব পালন করেন। পিএএফ প্ল্যানিং বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ১৯৬৯ সালের আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পিএএফ বেইসের দায়িত্ব পান ঢাকায় ১৯৬৯ সালে।[৫] মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণঃ এ.কে. খন্দকার উইং কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ ছিলেন। ২১শে নভেম্বর ১৯৭১ সালে তিনি পদোন্নতি পান গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বতী সরকার থেকে এবং জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী'র ব্যক্তিগত ডেপুটি ইনচার্জ বা উপ-প্রধান সেনাপতি হিসেবেও নিয়োগ পান।[৬] ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ভারতীয় সরকার বাংলাদেশে অন্তর্বতী সরকারের প্রায় সব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে, যেমন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, ১১ জন সেক্টর কমান্ডার, লেফট্যানেন্ট কর্নেল কে. এম. সফিউল্ল্যাহ-সহ এ.কে. খন্দকারকেও ঢাকায় নিয়ে আসেন পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান দেখতে। স্বাধীনতার পর তিনি এয়ার কমোডর হিসেবে দায়িত্ব পান ও আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধানে স্বাধীনতায় বীরত্বের পুরস্কার কমিটিতে জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী'র প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এই কমিটির কাজের ফলাফল ছিল ছিদ্রযুক্ত ও ব্যাখাহীন। যিনি কলকাতায় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একটা দালানে সময় কাটিয়েছেন তিনি রহস্যজনকভাবে বীরউত্তম খেতাব পান। তার সহকারী স্কোয়াড্রন লিডার বদরুল আলমও বীরউত্তম খেতাব পান। ১৯৭৩ সালে তিনি এয়ার ভাইস মার্শাল হিসেবে পদন্নোতি পান ও সিওএএস হিসেবে ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বিমান-এর চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি অবসরে যান মুশতাকের সরকারের সময়। রাজনৈতিক জীবনঃ ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় ভারতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৮৬ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৯০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তিনি এরশাদের সরকারের সাথে কাজ করেন পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে। এর আগে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জনসচেতনতা ছড়ানো উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের চেয়ারম্যান হিসেবে ২ বছর তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ৬ই জানুয়ারি ২০০৯ সালে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান ও তিনি একজন পাবনা-২ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন। নিজ এলাকার জনগণের কাছে অঙ্গীকার করেছেন যে, নদী ভাঙ্গণের কবল থেকে তাদের রক্ষা করতে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। মৃত্যুঃ বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন।

ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ বীর উত্তম

ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ বীর উত্তম

জন্ম: খালেদ মোশাররফ জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার মোশাররফগঞ্জ গ্রামে ১৯৩৭ সালের ১ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পরিবার: ভাই রাশেদ মোশাররফ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর পক্ষে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী হন। খালেদ মোশাররফের স্ত্রী রুবি মোশাররফ। মাহজাবিন খালেদ, আমিরিন খালেদ, তাদের কন্যা। শিক্ষা: তিনি কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে মেট্রিক পাশ করেন এবং ১৯৫৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট পাশ করেন। অতঃপর তিনি পাকিস্তানের কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন। সেনাবাহিনীতে মোশাররফ: ১৯৫৭ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভের পর প্রায় আট বছর (১৯৫৭-১৯৬৫) তিনি বিভিন্ন সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় খালেদ মোশাররফ চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। যুদ্ধের পর তিনি কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর তিনি মেজর হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন এবং তাকে ব্রিগেড মেজর হিসেবে খারিয়াতে ৫৭- ব্রিগেডে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার যখন জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে সেনা প্রশিক্ষণে যাওয়ার কথা, তখন ১৯৭০ সালের মার্চে তাকে ঢাকায় বদলি করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ মেজর খালেদ মোশাররফকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে কুমিল্লার চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি করা হয়। ২২ মার্চ নিজ পরিবারকে ঢাকায় রেখে কুমিল্লায় চলে যান খালেদ মোশাররফ। কুমিল্লায় ইউনিটে যোগ দেওয়ার পর তিনি দেখলেন সৈন্যরা বেশ উদ্বিগ্ন। সৈন্যদের উদ্বিগ্ন হওয়ার অন্যতম কারণ হলো- পাকিস্তানি বাহিনীর পাঞ্জাব ব্যাটালিয়ন এবং গোলন্দাজ ইউনিট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চতুর্দিকে পরিখা খনন করে মেশিনগান লাগিয়ে অবস্থান নিয়েছে। পাকিস্তানি অফিসাররা বললেন, এটি ক্যান্টনমেন্টের নিরাপত্তার স্বার্থেই। এই ধরনের কার্যাবলীতে ইস্ট বেঙ্গলের সৈন্যদের মধ্যে বেশ অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল। মেজর খালেদ মোশাররফ তখন সৈন্যদের শান্ত করতে আত্মরক্ষার্থে প্রহরী দ্বিগুণ করতে নির্দেশ দেন। ২৪ মার্চ সকাল ৭টার দিকে মেজর খালেদ মোশাররফ চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল খিজির হায়াত খানের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট প্রদান করেন। এদিন সকাল ১০টার দিকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল খিজির হায়াত খান মেজর খালেদ মোশাররফকে ডেকে বলেন, 'শমসেরনগরে নকশালবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে একটি কোম্পানি নিয়ে অ্যাকশন চালাতে হবে।' খালেদ মোশাররফ পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করতে পারলেন। তিনি জবাবে বললেন, 'মাত্র দুদিন হলো আমি এখানে এসেছি। আমার দায়িত্ব কেবল বুঝে নিচ্ছি, এমন সময় আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া আপনার জন্য ভুল হবে।' কিন্তু কর্নেল খিজির হায়াত খান তার কথায় অটল রইলেন। শেষপর্যন্ত ব্রিগেড কমান্ডার ইকবাল শফির অনুরোধে খালেদ মোশাররফকে শমসেরনগর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলো। মেজর খালেদ মোশাররফ তখন বলেন, 'যেহেতু আমাকে পাঠানো হচ্ছে, সেহেতু আমাকে একটি কোম্পানি দিলে হবে না। আমার সঙ্গে এক কোম্পানির চেয়ে বেশি সৈন্য লাগবে। হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য শক্তিশালী ওয়্যারলেস সেট দেওয়া হোক। এ ছাড়া, যেহেতু বেশ দূরে যাচ্ছি, আমার ট্রুপসের জন্য স্বয়ংক্রিয় ভারী ও হালকা অস্ত্র, মর্টার এবং যথেষ্ট পরিমাণ গোলাবারুদ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক।' প্রথমে ব্রিগেডিয়ার শফি আপত্তি করলেও মেজর খালেদ মোশাররফের অনড় মনোভাব দেখে কর্নেল খিজির হায়াত খানকে নির্দেশ দিলেন তাকে যাবতীয় সাহায্য করার জন্য। অনুমতি পাওয়ার পর মেজর খালেদ মোশাররফ ব্যাটেলিয়নের অ্যাডজুস্ট্যান্ট ক্যাপ্টেন গাফফারকে নির্দেশ দিলেন সমগ্র ব্যাটেলিয়ন থেকে বেছে বেছে ২৫০ জন সৈন্যকে আলফা কোম্পানিতে একত্রিত করার। একইসঙ্গে ব্যাটালিয়নের যতো ভারী অস্ত্র আছে সব নিয়ে নিতে এবং গোলাবারুদ এমন পরিমাণ নিতে যেন টানা এক মাস যুদ্ধ করা যায়। ব্রিগেড থেকে ২৬টি গাড়ি দেওয়া হয়েছিল। এই গাড়িতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বোঝাই করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। এসময় প্রতিটি দৃশ্যই নিজ চোখে দেখেছিলেন কর্নেল খিজির হায়াত খান এবং ব্রিগেড স্টাফরা। ২৪ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তারা শমসেরনগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। যাওয়ার আগে ক্যাপ্টেন মতিনকে খালেদ মোশাররফ বললেন, 'আমি চলে যাচ্ছি বলে ঘাবড়াবার কিছু নেই। এখন তুমিই সিনিয়র। যদি কোনো অঘটন ঘটে তাহলে চতুর্থ বেঙ্গলের বাকি ট্রুপসের নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করবে, প্রয়োজন হলে যুদ্ধ করে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসবে এবং আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। রাত আড়াইটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে কাছাকাছি এলে তারা দেখলেন রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া। প্রতিটি জায়গায় নেমে ব্যারিকেড সরিয়ে শহরে এসে পৌঁছালে দেখা গেল, ছাত্র জনতা রাস্তায় শুয়ে প্রতিবাদ করছে। মেজর খালেদ মোশাররফ জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, 'আজ বহু জায়গায় পাঞ্জাবি সৈন্যরা ছাত্র জনতার মিছিলে গুলি চালিয়েছে। এজন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আদেশে সেনাবাহিনীর চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আপনাদের বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু আমরা আপনাদের যেতে দিব না।' দুই পক্ষের মধ্যে কথাবার্তার কয়েক ঘণ্টা পর একপর্যায়ে সেখানে উপস্থিত হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানকারী চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের একটি কোম্পানির কমান্ডার মেজর শাফায়েত জামিল। তিনিও স্থানীয় ছাত্র ও জনতাকে বোঝান। একপর্যায়ে ২৫ মার্চ সকাল ৭টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছেড়ে দুপুর ২টার দিকে শমসেরনগর পৌঁছান। ২৫ মার্চ রাতে পরিস্থিতি খানিকটা ঘোলাটে মনে হল মেজর খালেদ মোশাররফের। কারণ এখানে নকশালপন্থীদের কোনো উপদ্রব নেই। সকল চা বাগানে থাকা পশ্চিম পাকিস্তানিরা ঢাকায় ফিরে গেছে। তিনি পুরোপুরিভাবে বুঝলেন তাকে কৌশল করে এখানে পাঠানো হয়েছে। সারাদিন হেড কোয়ার্টারে বার বার যোগাযোগ করেও তিনি সংযোগ পাননি। ২৬ মার্চ বিকেলে তিনি স্থানীয় কারও কারও কাছে শুনলেন, ঢাকায় গোলাগুলি হয়েছে, বহু মানুষ মারা গেছে। তাও আবছা সংবাদের মতো। এরপর ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি মেজর শাফায়েত জামিলের কাছে একে একে ঢাকায় চালানো পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডবলীলা এবং নৃশংসতার ঘটনা শুনেন। বেশ কয়েক ঘণ্টা ভাবার পর মেজর খালেদ মোশাররফ স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং লেফটেন্যান্ট মাহবুবকে বললেন, 'আমরা আর কেউ পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করব না, এখন থেকে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ শুরু। সব সৈনিকদের তৈরি হতে বলো।' এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকার দিকে রওয়ানা হয়ে যাবেন এবং তাকে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একত্রিত করতে হবে। তিনি ওয়ারলেসে মেজর শাফায়েত জামিলের সঙ্গে কথা বলে জানান, কুমিল্লার রাস্তার দিকে খেয়াল রাখতে এবং তারা শিগগির ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছে যাবেন। ভোর ৫টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকা কর্নেল খিজির হায়ার খানের সঙ্গে কথা হয় খালেদ মোশাররফের। তিনি বলেন, 'পরিস্থিতি সব স্বাভাবিক'। এরইমধ্যে মেজর শাফায়েত জামিল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'তারা কোথায় এবং কেন তাদের আসতে এতো দেরি হচ্ছে!' এসময় মেজর খালেদ মোশাররফ খিজির হায়াত খানসহ সব পাকিস্তানি অফিসারদের গ্রেপ্তার করার আদেশ দেন। ২৭ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। তখন মেজর খালেদ মোশাররফ কুমিল্লা অঞ্চলে অবস্থানরত সব বাঙালি অফিসারদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় মেঘনা নদীকে উত্তরে রেখে পশ্চিম প্রতিরক্ষা লাইন তৈরি করে, দক্ষিণে ময়নামতি সীমান্ত পর্যন্ত মুক্ত করে প্রতিরক্ষা লাইন তৈরি করা এবং দক্ষিণে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। অন্যদিকে, উত্তর-পূর্বে মৌলভীবাজার থেকে সিলেট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা মুক্ত করে সিলেটে একটি ঘাঁটি গড়ে তোলা। এই পরিপ্রেক্ষিতে মেজর খালেদ মোশাররফ প্রথমে ভৈরববাজারে ২ কোম্পানি সৈন্য পাঠিয়ে দেন। আরেকটি পার্টিকে তিনি কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হতে বলেন। মেঘনার পূর্ব পাড়ে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চতুর্দিকে এবং তিতাস নদীর চতুর্দিকে একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরির ব্যবস্থা করেন। ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে এক কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধাকে সিলেটের দিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মেজর খালেদ মোশাররফের ঘোষণা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মহকুমা প্রশাসক রকিব পুলিশ ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব জেলা ও মহকুমাগুলোতে জানান যে, 'মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করেছে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সিলেট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা শত্রুমুক্ত করেছে।' একইসঙ্গে খালেদ মোশাররফ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে ঐতিহাসিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। এই বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। সেই বৈঠকে মেজর খালেদ মোশাররফ বলেছিলেন, 'আমাদের যে অস্ত্র আছে, এই অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশিদিন টিকে থাকা যাবে না। আমাদের অতিসত্বর বন্ধু রাষ্ট্র বা অন্য কোথাও থেকে অস্ত্রের ব্যবস্থা করতে হবে এবং একইসঙ্গে কোনো নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকার গঠন করা হোক, যেন আমরা বহির্বিশ্বের দ্রুত সহযোগিতা পাই।' এর কয়েকদিন পর ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের জুলাই মাসে ব্রিগেড গঠন করা হলে চতুর্থ, নবম এবং দশম ইস্ট বেঙ্গলকে নিয়ে গঠিত হয় কে ফোর্স ব্রিগেড। একই মাসে সেক্টর গঠন করা হলে মেজর খালেদ মোশাররফকে ২ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে মেজর খালেদ মোশাররফের অধীনে থাকা ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা ছিল সবচেয়ে বেশি। নিয়মিত বাহিনী ও গণবাহিনী মিলে এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৩ হাজার। ২ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন এলাকা ছিল নোয়াখালী জেলা, কুমিল্লা জেলার আখাউড়া-ভৈরব রেললাইন পর্যন্ত এবং ফরিদপুর ও ঢাকার অংশবিশেষ। ২ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ছিল ত্রিপুরার মেলাঘরে। ২ নম্বর সেক্টরে মোট সাব সেক্টর ছিল ৬টি, যথা গঙ্গাসাগর, মন্দভাগ, সালদা নদী, মতিনগর, নির্ভয়পুর ও রাজনগর। ২ নম্বর সেক্টরের অধীনেই গড়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ ফিল্ড হাসপাতাল। মুক্তিযুদ্ধের মে মাসে আগরতলার সোনামুড়ায় বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল গড়ার পেছনে মেজর খালেদ মোশাররফের অসামান্য অবদান ছিল। পরবর্তীতে এই হাসপাতাল বিশ্রামগঞ্জে স্থানান্তর করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরের বিখ্যাত সব অপারেশনে নির্দেশনা দিয়েছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। এরমধ্যে বিলোনিয়ার প্রথম যুদ্ধ, শালদা নদীর যুদ্ধ, মন্দভাগ অপারেশন, কাশিমপুর রেলব্রিজ ধ্বংস, শাহপুরের যুদ্ধ, শাসিয়ালী ও শাহরাস্তির চিতোষীর যুদ্ধ, চরশোলাদী গ্রামের যুদ্ধ ও ছাতুরার অ্যামবুশসহ অসংখ্য যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকায় দুর্ধর্ষ গেরিলা আক্রমণের জন্য তৈরি ঢাকা প্লাটুন বা ক্র্যাক প্লাটুন গড়ে উঠেছিলো মেজর খালেদ মোশাররফের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ নির্দেশে এবং অবদানে। ক্র্যাক প্লাটুন গড়ে উঠেছিল এমন তরুণদের নিয়ে, যারা অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং ঢাকা শহরকে হাতের তালুর মতোই চিনে। খালেদ মোশাররফের নির্দেশে আরবান গেরিলা যুদ্ধের জন্য বিশেষায়িতভাবে তৈরি করা হয়েছিল এই দলটিকে। খালেদ মোশাররফ চেয়েছিলেন এই সদস্যরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে থাকা বিদেশি সাংবাদিক ও অতিথিদের ঢাকা শহরের অবস্থা যে স্বাভাবিক নয়, তা জানান দেবে। আর এজন্য শহরের আশপাশে বেশকিছু গ্রেনেড ও গুলি ছুঁড়বে। কিন্তু এই তরুণরা ঢাকায় এসে ৯ জুন সরাসরি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গ্রেনেড হামলা করে এবং বেশ কয়েকজনকে হত্যা করে। যা ছিল অকল্পনীয় একটি কাজ। এদিন সন্ধ্যায় বিবিসির খবর থেকে ঢাকার খবর পেয়ে খালেদ মোশাররফ এই অপারেশনের কথা জানতে পেরে বলেন, 'দিজ অল আর ক্র্যাক পিপল!' সেই থেকেই ক্র্যাক প্লাটুন নামে পরিচিত হয়ে উঠে ঢাকা প্লাটুন। মুক্তিযুদ্ধের ২৩ অক্টোবর মেজর খালেদ মোশাররফের মাথায় গুলি লাগায় তিনি গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে তাকে ভারতে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে ২ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার করা হয় মেজর এ টি এম হায়দারকে। খালেদ মোশাররফের জন্ম ১৯৩৭ সালের ১ নভেম্বর জামালপুরের ইসলামপুর থানার মোশাররফগঞ্জে। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে মেট্রিক এবং ১৯৫৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট পাশ করে পাকিস্তানের কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৫৭ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন পান। ১৯৫৭ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভের পর ৮ বছর বিভিন্ন সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন তিনি। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় খালেদ মোশাররফ চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে নিয়োগ লাভ করেছিলেন। এরপর কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর তিনি মেজর হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি পাওয়ার পরে তাকে ব্রিগেড মেজর হিসেবে খারিয়াতে ৫৭ ব্রিগেডে নিয়োগ দেওয়া হয়। জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে সেনা প্রশিক্ষণে যাওয়ার কথা থাকলেও ১৯৭০ সালের মার্চে তাকে ঢাকায় বদলি করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। স্বাধীনতার পর খালেদ মোশাররফ ঢাকা সেনা সদর দপ্তরে স্টাফ অফিসার হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নিহত হবার পর ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন খালেদ মোশাররফ। সেসময় সেনাপ্রধান হয়েছিলেন তিনি। ৩ দিন পর অবসর প্রাপ্ত কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে আরেকটি পালটা সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন খালেদ মোশাররফ। সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র নবম এবং দশম খণ্ড।

মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম

মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম

জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ রফিকুল ইসলাম ১৯৪৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরে চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার নাওড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। তার বাবার নাম আশরাফ উল্লাহ ও মায়ের নাম রহিমা বেগম। তাঁর স্ত্রী রুবি ইসলাম। দাম্পত্য জীবনে তিনি এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। ভাই ছয় বোনের মধ্যে রফিকুল ইসলাম ছিলেন সবার বড়। জন্মস্থান নাওড়া গ্রামেই প্রাথমিক স্কুলের পড়াশোনা শুরু। তবে পিতা সরকারি কর্মকর্তা (স্কুল ইন্সপেক্টর) হওয়ায়, বদলির সুবাদে পরিবারের সাথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থেকে লেখাপড়া করেন।তিনি। ১৯৫৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা মডেল হাই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিকুলেশেন ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে রফিকুলইসলাম ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি জড়িত হয়েপড়েন। [৩] ১৯৬৫ সালে কাকুল মিলিটারী একাডেমী থেকে বিএসসি পাস করেন। ১৯৮১ সালে তিনি আমেরিকার হার্ভাড বিজনেস স্কুলে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম কোর্স সম্পন্ন করেন। সামরিকঃ রফিকুল ইসলাম ১৯৬৩ সালে অফিসার পদে নির্বাচিত হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান কাকুল মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে কমিশন অর্জন করেন। একই সময়ে বিএসসি ডিগ্রি পরীক্ষায় উত্তীর্র্ন হন। ১৯৬৮ সালে লাহোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বদলি হন এবং তৎকালিন যশোর ক্যান্টনমেন্ট রেজিমেন্টের অ্যাডজুট্যান্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। কিছুদিন দায়িত্ব পালন শেষে দিনাজপুরে ইপিআরের ৮ নম্বর উইংয়ের অ্যাসিসটেন্ট উইং কমান্ডার পদে বদলি হন। পরে ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের চট্টগ্রাম সেক্টর হেডকোয়ার্টারে অ্যাডজুট্যান্ট পদে নিয়োগ পান। সেখান থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৯ এপ্রিল সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি পান। মুক্তিযুদ্ধে অবদানঃ ১৯৭১ সালে রফিকুল ইসলাম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদে চট্টগ্রামে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এ অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে প্রেষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সেনা মোতায়েন পরিস্থিতি দেখে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি স্বাধীনতার প্রয়োজনে বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তদনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তিনি তার অধীনস্থ বাঙালি অফিসার ও সিপাহিদের সাথে আলোচনা করে কর্তব্য স্থির করেন, এবং সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি অফিসারদের সাথে গোপন বৈঠক করে প্রয়োজনে বিদ্রোহের জন্যে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৭১ এর ২৪শে মার্চ রাতেই ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম কার্যত বিদ্রোহ শুরু করেন। তার আদেশ পেয়ে সীমান্ত ফাঁড়িতে বাঙালি সৈন্যরা অবাঙালি সিপাহিদের নিরস্ত্র ও নিষ্ক্রিয় করে চট্টগ্রামে এসে প্রতিরোধ যুদ্ধে যোগদানের জন্যে প্রস্তুত হয়। এম. আর. চৌধুরী ও মেজর জিয়াউর রহমানের অনুরোধে সেদিন রফিকুল ইসলাম তাদের চট্টগ্রামে আসার নির্দেশ বাতিল করেন। কিন্তু পরদিন ২৫শে মার্চ ১৯৭১ তারিখে সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য অনুধাবন করে ক্যাপ্টেন রফিক সক্রিয় বিদ্রোহ শুরু করেন এবং ইপিআরের অবাঙালি সৈন্য ও অফিসারদের জীবিত অবস্থায় বন্দী করে রেলওয়ে হিলে তার হেডকোয়ার্টার স্থাপন করেন। তার অধীনে ন্যস্ত সৈনিকরা এম. ভি. সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল চৌধুরী ও মেজর জিয়াউর রহমান সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় ২০ বালুচ রেজিমেন্ট-এর সৈন্যরা চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার-এর সহস্রাধিক বাঙালি সৈনিক ও অফিসারকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। মেজর জিয়াউর রহমানের অধীনে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর বাঙালি অফিসার ও সৈনিকরা ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে কালুরঘাট ব্রিজের দিকে অবস্থান নেয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে চট্টগ্রামের অন্যান্য সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আগত ক্যাপ্টেন রফিকের অধীনস্থ ইপিআর সৈনিকদের মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে ক্যাপ্টেন রফিকের বাহিনীর সাথে যোগদানে বাধা দেন এবং ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের সৈনিকদের সাথে কালুরঘাট ব্রিজ এলাকায় অবস্থান নিতে বাধ্য করেন। এ কারণে ক্যাপ্টেন রফিক সেনাবলের অভাবে চট্টগ্রামে যথাযথ দখল বজায় রাখতে ব্যর্থ হন এবং এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রচুর ক্ষতি সাধন করে পশ্চাদপসরণ করেন। পরবর্তীতে ক্যাপ্টেন রফিক তার বাহিনী নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ করেন এবং ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে তার হেডকোয়ার্টার সীমান্তের ওপারে হরিণায় স্থাপন করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে এখান থেকেই তিনি ১ নং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে চট্টগ্রাম এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে ন্যস্ত হন। ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

মেজর সি আর দত্ত বীর উত্তম

মেজর সি আর দত্ত বীর উত্তম

জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ চিত্ত রঞ্জন দত্তের জন্ম ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি আসামের শিলংয়ে। তার পৈতৃক বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে। তার বাবার নাম উপেন্দ্র চন্দ্র দত্ত এবং মায়ের নাম লাবণ্য প্রভা দত্ত। শিলংয়ের 'লাবান গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে' দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন৷ পরবর্তীকালে বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে হবিগঞ্জে এসে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন৷ হবিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে ১৯৪৪ সালে তিনি মাধ্যমিক পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার আশুতোষ কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়ে ছাত্রাবাসে থাকা শুরু করেন৷ এরপর খুলনার দৌলতপুর কলেজের বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন৷ পরে দৌলতপুর কলেজ থেকেই বি.এস.সি পাশ করেন৷ কর্মজীবনঃ চিত্ত রঞ্জন দত্ত ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন৷ কিছুদিন পর 'সেকেন্ড লেফটেনেন্ট' পদে কমিশন পান। ১৯৬৫ সালে সৈনিক জীবনে প্রথম যুদ্ধে লড়েন তিনি৷ ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে আসালংয়ে একটা কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেন তিনি৷ এই যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার তাকে পুরস্কৃত করে৷ মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেব দায়িত্ব দেয়া হয় এম.এ.জি ওসমানীকে। তিনি বাংলাদশেকে মোট ১১টি সেক্টরে ভাগ করে নেন৷ সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল এবং খোয়াই শায়স্তাগঞ্জ রেল লাইন বাদে পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট ডাউকি সড়ক পর্যন্ত এলাকা নিয়ে ৪নং সেক্টর গঠন করা হয় এবং এই সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন চিত্ত রঞ্জন দত্ত৷ সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর সিলেটের রশীদপুরে প্রথমে ক্যাম্প বানান তিনি৷ চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চা বাগান৷ চা বাগানের আড়ালকে কাজে লাগিয়ে তিনি যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করে দিতেন৷ পরবর্তী সময়ে তিনি যুদ্ধের আক্রমণের সুবিধার্থে রশীদপুর ছেড়ে মৌলভীবাজারে ক্যাম্প স্থাপন করেন৷

মেজর মীর শওকত আলী বীর উত্তম

মেজর মীর শওকত আলী বীর উত্তম

জন্ম, শিক্ষাঃ তার জন্ম ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জানুয়ারী পুরনো ঢাকার নাজিরা বাজারের আগাসাদেক রোডে। তিনি মাহুতটুলী প্রি-প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন; আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় চার বিষয়ে লেটার মার্কসসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। এরপর এইচএসসি পাস করেন ঢাকা কলেজ থেকে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন পেয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণঃ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বেঙ্গল রেজিমেন্টে মেজর পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে ৫নং সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও মীর শওকত আলী কয়েকটি সেক্টরে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালনের জন্য স্বাধীনতা লাভের পর তাকে বীর উত্তম খেতাব প্রদান করা হয়।

উঃ কঃ ম খাদেমুল বাশার বীর উত্তম

উঃ কঃ ম খাদেমুল বাশার বীর উত্তম

জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম এম এইচ শাহ। তিনি সাতক্ষীরা প্রাণনাথ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং রাজশাহী কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনী একাডেমীর ফ্লায়িং শাখায় ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। কর্মজীবনঃ মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে রাডার স্কোয়াড্রনের অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মে মাসের শুরুতে আরও কয়েকজনের সঙ্গে পালিয়ে ভারতে যান এবং যুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার জুন মাস থেকে মুক্তিবাহিনীর ৬ নম্বর সেক্টরে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বৃহত্তর রংপুর ও বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার অংশবিশেষ (ঠাকুরগাঁও মহকুমা, বর্তমান ঠাকুরগাঁও জেলা) নিয়ে ছিল এ সেক্টর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে এ সেক্টরে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ সেক্টরে একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, তা হলো সেক্টরসহ কয়েকটি সাব-সেক্টরের অবস্থান বাংলাদেশের ভূখণ্ডেই ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তা দখল করতে পারেনি। ৬ নম্বর সেক্টর সামরিক ও ভৌগোলিক কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর পশ্চিম ও উত্তরে ভারতের শিলিগুড়ি করিডর। খাদেমুল বাশারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পরিচালনায় ৬ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য অপারেশন করেন। এর মধ্যে ভূরুঙ্গামারীর যুদ্ধ অন্যতম। নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ৬ নম্বর সেক্টরে গণবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আখতারুজ্জামান মণ্ডল। তিনি একটি দলের দলনেতা ছিলেন। সেক্টর কমান্ডার মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার ৬ নম্বর সেক্টরের প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার অবিচল আস্থা অর্জন করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে মিশতেন এবং সময়-সুযোগমতো তাদের সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করতেন। রোজা শুরু হওয়ার আগের দিন দুপুরের পর তিনি ভূরুঙ্গামারীর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থানের ওপর আক্রমণ অভিযান পরিকল্পনার জন্য সন্ধ্যার কিছু আগেই সাবসেক্টর অফিসে ক্যাপ্টেন নওয়াজিশসহ কয়েকজনকে নিয়ে আলোচনায় বসলেন। একটির পর একটি প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। একপর্যায়ে ক্যাপ্টেন নওয়াজিশ খাদেমুল বাশারকে জিজ্ঝাসা করলেন “স্যার, আপনি অনেক দিন পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন। কোনো সংবাদ পাননি। তাই তাদেরকে দেখে এলে ভালো হয়।” খাদেমুল বাশার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেসে বললেন, “ঠিকই বলেছ, তবে কি জানো, তোমরা মুক্তিযোদ্ধারাই আমার পরিবারের আপন সদস্য। তোমাদের সঙ্গে থাকা আর আমার পরিবারের সঙ্গে থাকা একই কথা। আগে অভিযান সফল করো। তোমরা শত্রুর সাথে যুদ্ধ করবে আর আমি পরিবারের সাথে দেখা করব, তা কী করে হয়।” সেক্টর কমান্ডারের পরিকল্পনা ও নির্দেশ অনুযায়ী রোজার আগের রাতে ভূরুঙ্গামারীর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘাঁটি আক্রমণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। রাত নয়টায় অভিযানে অংশগ্রহণকারী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আবেগময় বক্তৃতা করলেন। “জয় বাংলা, বাংলার জয়” এবং “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি” গানটি টেপ রেকর্ডারে বাজিয়ে শোনানো হলো। ‘অভিযানে অংশগ্রহণকারী দেড় শ মুক্তিযোদ্ধা প্রত্যেকের সঙ্গে তিনি হাত মেলালেন এবং ব্যক্তিগতভাবে আদর করলেন। বড় ও ছোট ঝুঁকিপূর্ণ আক্রমণ পরিচালনা, অ্যামবুশ ও রেইড ইত্যাদি নিজেই পরিচালনা করতেন। সফল রণকৌশল, অস্ত্র চালনা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, আত্মবিশ্বাস, সেই সাথে সহকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তার গভীর অনুভূতি, স্নেহ ইত্যাদি মুক্তিযোদ্ধাদের মন থেকে কোনো দিন মুছে যাবে না।

মেজর কাজী নুরুজ্জামান বীর উত্তম

মেজর কাজী নুরুজ্জামান বীর উত্তম

প্রারম্ভিক জীবনঃ কাজী নূর–উজ্জামানের জন্ম যশোর জেলায়। তার পিতার নাম খান সাহেব কাজী সদরুলওলা এবং মাতা রতুবুন্নেসা। কাজী নূর–উজ্জামানের পড়াশোনা কলকাতায়। সেখানে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে রসায়নে পড়ার সময় ১৯৪৩ সনে ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবাহিনীতে যোগ দেন।[৪] দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বার্মার উপকূল ও সুমাত্রায় যুদ্ধ করেন। ১৯৪৬ সালে পণ্ডিত জহরলাল নেহেরুর আহবানে অনেকে নৌবাহিনী থেকে ভারতীয় সেনবাহিনীতে চলে আসে। কাজী নূর–উজ্জামান তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রশিক্ষণের জন্য কাজী নূর–উজ্জামান দেরাদুনে রয়্যাল ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে চলে যান। ১৯৪৭ সালে তিনি এই একাডেমি থেকে কমিশন লাভ করেন। ১৯৪৭ এর ১৫ আগস্টের পর কাজী নূর–উজ্জামানের পরিবার পাকিস্তানে আসার সিদ্ধান্ত নিলে নুরুজ্জামান পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে নবীন অফিসার হিসাবে যোগ দেন। শিক্ষা ও কর্মজীবনঃ কাজী নূর–উজ্জামানের পড়াশোনা কলকাতায়। সেখানে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে রসায়নে পড়ার সময় তিনি ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবাহিনী, রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বার্মার উপকূল ও সুমাত্রায় যুদ্ধ করেন। ১৯৪৬ সালে পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু'র আহবানে অনেকে নৌবাহিনী থেকে ভারতীয় সেনবাহিনীতে চলে আসে। কাজী নূর–উজ্জামান তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি রয়্যাল ইন্ডিয়ান আর্মিতে চাকরি স্থানান্তরিত করে রয়্যাল ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন এবং প্রশিক্ষণের জন্য দেরাদুনে রয়্যাল ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে চলে যান। ১৯৪৭ সালে তিনি এই একাডেমি থেকে কমিশন লাভ করেন। ১৯৪৭ এর ১৫ আগস্টের পর কাজী নূর–উজ্জামানের পরিবার পাকিস্তানে আসার সিদ্ধান্ত নিলে নূরুজ্জামান পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে নবীন অফিসার হিসাবে যোগ দেন। ১৯৪৯ সালে ইংল্যান্ডে আর্টিলারি কোর্স সমাপ্ত করে আসার পর তিনি পাকিস্তানের নওশেরায় আর্টিলারি সেন্টার এন্ড স্কুলে প্রশিক্ষক নিয়োজিত হন। পরের বছর হন অফিসার ট্রেনিং স্কুলের ইনস্ট্রাক্টর। ১৯৫৬ সালে মেজর পদে পদোন্নতি পান এবং ১৯৫৮ সালে স্টাফ কলেজ সম্পন্ন করেন। ১৯৫৮ সালে সেনাপ্রধান আইয়ুব খান দেশে সামরিক আইন জারি করলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়ে পড়েন। তখন (১৯৬২ সালে) তাকে প্রেষণে ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনে (ইপিআইডিসি) পাঠানো হয়। এরই মধ্যে তিনি লেফটেনেন্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি পান। ইপিআইডিসি থেকে তিনি স্বল্প সময় পরে তিনি সেনাবাহিনীতে ফিরে আসেন এবং স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তিনি আবার সেনাবাহিনীতে ফিরে যান এবং যুদ্ধকালীন সময়ের পরপরই পুনরায় সিভিল পেশায ফেরত আসেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানঃ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির উপর গণহত্যা শুরু করলে কাজী নূর–উজ্জামান ঢাকা ত্যাগ করে স্বপরিবারে ময়মনসিংহ চলে যান। ২৮ মার্চ দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইল হয়ে ময়মনসিংহে পৌঁছে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক কাজী মুহাম্মদ সফিউল্লাহর সঙ্গে দেখা করেন। ৪ এপ্রিল ১৯৭১ হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর ও তদূর্ধ্ব পদবির কর্মকর্তাদের প্রথম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একাত্তরের মে মাসে তাকে সভাপতি করে একটি পর্ষদ গঠন করা হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্যাচ ক্যাডেট নির্বাচনের জন্য। এই ক্যাডেটরা কমিশন লাভ করেন সে বছরের ৯ অক্টোবর। সাত নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হক ২৬ সেপ্টেম্বর ভারতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে কাজী নূর–উজ্জামান তার স্থলাভিষিক্ত হন। কাজী নূরুজ্জামানের স্ত্রী ডাক্তার সুলতানা জামান, দুই মেয়ে-ডাক্তার নায়লা জামান ও নৃত্যশিল্পী লুবনা মরিয়ম এবং এক ছেলে নাদিম ওমরসহ ভারতে আশ্রয় নেন। ডা. সুলতানা জামান সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় ৭ নম্বর সেক্টরের মাহদিপুর সাব সেক্টরে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলেন। তাকে সাহায্য করেন ডা. মোয়াজ্জেম। ১৫ বছরের কিশোর নাদিম ওমর লালগোলা সাব সেক্টরের কমান্ডার ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ করেন।

মেজর আবু তাহের বীর উত্তম

মেজর আবু তাহের বীর উত্তম

জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ আবু তাহের ব্রিটিশ শাসিত ভারতেবর্ষের আসাম প্রদেশের বদরপুরে ১৯৩৮ সালের ১৪ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পরে আসাম থেকে তার পরিবার বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা উপজেলায় ফিরে আসে। তার বাবার নাম মহিউদ্দিন আহমেদ এবং মায়ের নাম আশরাফুন্নেসা। তার বাবা মহিউদ্দিন আহমেদ পেশায় আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে ও পরবর্তীকালে পাকিস্তান রেলওয়ের একজন স্টেশন মাস্টার ছিলেন। তার মা ছিলেন একজন গৃহিণী। আবু তাহের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করেন চট্টগ্রামের প্রবর্তক বিদ্যালয় ও কুমিল্লার ইউসুফ বিদ্যালয় থেকে। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে সিলেটের এমসি কলেজ থেকে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদানের আগপর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অল্প কিছুদিন পড়াশোনা করেন।[১] কর্মজীবনঃ ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৬২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে কাশ্মীর আর শিয়ালকোট সেক্টরে যুদ্ধ করেন তিনি৷ সে যুদ্ধে তিনি আহতও হন৷ তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একমাত্র বাঙালি অফিসার হিসাবে তাকে 'মেরুন প্যারাস্যুট উইং' নামক সম্মাননা প্রদান করা হয়৷ মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার হিসাবে তাহের কমান্ডো প্রশিক্ষণ লাভ করেন ও পরে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৬৯ সালে আবু তাহের যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্পেশাল কমান্ডো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে আটকা পড়ে ছিলেন। সেখান থেকে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে রাতের অন্ধকারে ভারতে পালিয়ে যান। পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসার সময় তার সহযোগী ছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন, মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর, মঞ্জুরের স্ত্রী সন্তানসহ কয়েকজন। তারপর বাংলাদেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কর্নেল আতাউল গনি ওসমানী এর নির্দেশে সেক্টরগুলো ঘুরে দেখেন এবং কৌশলগতভাবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ১১ সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব নেন। যুদ্ধের সময় তার স্টাফ অফিসার ছিলেন নিজের আপন ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন। তাহেরের বড় ভাই আবু ইউসুফ বীর বিক্রম, ছোট ভাই আবু সাঈদ আহমেদ, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীর প্রতীক, শাখাওয়াত হোসেন বাহার বীর প্রতীক এবং ছোট বোন ডলি আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধের সময় তাহের সম্মুখ সমরে আহত হয়ে এক পা হারান। কর্নেল তাহেরের সব ভাইবোন মুক্তিযুদ্ধে তার নেতৃত্বে ১১ নং সেক্টরে যৌথভাবে যুদ্ধ করেছেন।[২] ভাই-বোনদের এই দলটিকে "ব্রাদার্স প্লাটুন" বলে ডাকা হত।

মেজর আবু ওসমান চৌধুরী

মেজর আবু ওসমান চৌধুরী

জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ আবু ওসমান চৌধুরী ১৯৩৬[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানার মদনেরগাঁও গ্রামের চৌধুরী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আব্দুল আজিজ চৌধুরী এবং মায়ের নাম মাজেদা খাতুন। নিজ গ্রাম মদনেরগাঁওয়ের ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৪৫ সালে পার্শবর্তী গ্রামে মানিকরাজ জুনিয়র হাই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। চান্দ্রা ইমাম আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে ১৯৫১ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। পরে ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি ভর্তি হন তিনি। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, শারীরিক অসুস্থতা ও পারিবারিক নানা সমস্যার কারণে ঢাকা কলেজে এইচএসসি সম্পন্ন করতে পারেন নি তিনি। পরে ১৯৫৪ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ১৯৫৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে তিনি বিএ পাস করেন। কর্মজীবনঃ ১৯৫৭ সালে আবু ওসমান ঢাকা বিমানবন্দরে 'বিমানবন্দর অফিসার' হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এই পদের প্রশিক্ষণে থাকাকালীনই তিনি সেনাবাহিনীতে কমিশনের জন্য প্রদত্ত পরীক্ষায় পাস করায় আন্তবাহিনী নির্বাচন বোর্ডে উপস্থিত হবার জন্য আহ্বান পান। ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি তত্‍কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কোহাটে অবস্থিত অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে (ওটিএস) যোগ দেন। সেখানে ৯ মাসের কঠিন প্রশিক্ষণের পর ১৯৫৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে তিনি মেজর পদে পদন্নতি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আবু ওসমান চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন মেজর পদে কুষ্টিয়ায় কর্মরত ছিলেন। অপারেশন সার্চলাইট-এর সংবাদ পেয়ে ২৬শে মার্চ সকালে বেলা ১১টায় তিনি চুয়াডাঙ্গার ঘাঁটিতে পৌঁছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সৈন্য যোগ দেন। এর আগে ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ আবু ওসমান চৌধুরী পদ্মা মেঘনার ওপারে কুষ্টিয়া থেকে বরিশাল জেলা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাকে দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গণ নামকরণ করে সে রণাঙ্গণের অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেন। পরে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার তাকে দক্ষিণ পশ্চিমাংসের আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করেন। মে মাসের শেষার্ধে প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনকে দুই ভাগ করে ৮নং ও ৯নং সেক্টরদ্বয় গঠন করেন এবং ৮ নং সেক্টরের দায়িত্বে আবু ওসমানকে নিয়োগ করা হয়। প্রাথমিকভাবে সে সময় ওই সেক্টরের অপারেশন এলাকা ছিল কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ও পটুয়াখালী জেলা। মে মাসের শেষে অপারেশন এলাকা সংকুচিত করে কুষ্টিয়া ও যশোর, খুলনা জেলা সদর, সাতক্ষীরা মহকুমা এবং ফরিদপুরের উত্তরাংশ নিয়ে এই এলাকা পুনর্গঠন করা হয়। এই সেক্টরের প্রধান ছিলেন আবু ওসমান চৌধুরী এবং পরে মেজর এম এ মঞ্জুর।

মেজর এম এ জলিল

মেজর এম এ জলিল

জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ এম এ জলিল বরিশাল জেলার উজিরপুরে ১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম মোহাম্মদ আব্দুল জলিল। তবে তিনি মেজর এম এ জলিল নামেই পরিচিত। তার পিতা জনাব আলী সিকদার ও মা রাবেয়া খাতুন। উজিরপুর-বারোপাইকা ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন থেকে ১৯৫৯ সালে তিনি মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের মারি ইয়ং ক্যাডেট ইনস্টিটিউশন থেকে আইএ পাস করেন এবং এর পাশাপাশি গ্রহণ করেন সামরিক শিক্ষা৷ ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান একাডেমি থেকে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। পরে মুলতানে কর্মরত থাকাকালে তিনি ইতিহাসে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন৷ সেনাজীবনঃ ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে ট্রেনি অফিসার হিসেবে যোগদান করেন৷ সামরিক বাহিনীতে চাকুরিরত অবস্থায় তিনি বি.এ পাশ করেন৷ ১৯৬৫ সালে তিনি কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং ১২নং ট্যাঙ্ক ক্যাভালরি রেজিমেন্ট অফিসার হিসেবে তৎকালীন পাক-ভারত যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন৷ ১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন৷ তিনি ১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ছুটি নিয়ে বরিশালে আসেন এবং মার্চে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি নবম সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব লাভ করেন৷ মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ ১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি অসুস্থ মাকে দেখার জন্য এক মাসের ছুটিতে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) আসেন মেজর মোহাম্মদ আব্দুল জলিল। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযানের পর তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিরোধযুদ্ধ সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।[২] বরিশাল, পটুয়াখালী ও খুলনা অঞ্চলে সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি স্থানীয় ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র-যুবক ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগঠিত করেন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের সামরিক কাঠামো পুনর্গঠনের সময় তাঁকে ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তাঁর অনুমোদন ও সহায়তায় খুলনা অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়, যার মধ্যে খুলনা বেতার কেন্দ্রের ওপর পরিচালিত আক্রমণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রার ফলে ২৬ এপ্রিল বরিশাল পতিত হয় এবং দক্ষিণাঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। অস্ত্র সংগ্রহ, পুনর্গঠন এবং সামরিক প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে মেজর জলিলসহ দক্ষিণাঞ্চলের বহু রাজনৈতিক নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ভারতে গমন করেন। ভারতের হাসনাবাদে প্রাথমিক পুনর্গঠনের পর টাকিতে ৯ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়। বৃহত্তর বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ এবং যশোরের একাংশ নিয়ে ৯ নম্বর সেক্টর গঠিত হয়। সেক্টরটির অধীনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবির প্রতিষ্ঠা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং গেরিলা ও নিয়মিত সামরিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম সুসংগঠিত করা হয়। টাকিস্থ সেক্টর সদর দপ্তর থেকেই মেজর জলিল তাঁর বাহিনীর সামরিক কার্যক্রম সমন্বয় ও পরিচালনা করেন। ১৯৭১ সালের মধ্যভাগে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীবহুল এলাকায় নৌ-অভিযান পরিচালনার লক্ষ্যে একটি নৌ ইউনিট সংগঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেজর জলিলের নেতৃত্বে ৯ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা বরিশাল, খুলনা, সাতক্ষীরা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক গেরিলা ও নিয়মিত সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। এসব অভিযানের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত হয়। নভেম্বরে জলিলকে সেক্টর কমান্ডারের পদ থেকে অপসারণ করা হয়।[২][৯][১০] তিনি তা উপেক্ষা করেন এবং চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জন না করা পর্যন্ত দেশের জন্য লড়াই চালিয়ে যান। যৌথ বাহিনীর চূড়ান্ত অভিযানের ধারাবাহিকতায় ৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা[১১] এবং ৮ ডিসেম্বর বরিশাল ও পটুয়াখালী শত্রুমুক্ত হয়।[১২][১৩] ১৭ ডিসেম্বর, তিনি মিত্র বাহিনীর সাথে বিজয়ী বেশে খুলনা শহরে প্রবেশ করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান ৮,০০০ সৈন্য নিয়ে খুলনা সার্কিট হাউসে আত্মসমর্পণ করেন।[১৪][১৫] ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর বরিশালে তাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়৷ ২১ ডিসেম্বর তিনি হেমায়েতউদ্দিন মাঠে জনসভায় ভাষণ দেন৷[১][৫] স্বাধীনতার পর, ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর সেক্টর ৮-এর মুক্তিযোদ্ধারা তাকে অসদাচরণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।[১৬] তার স্মৃতিকথা অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা-তে তিনি দাবি করেন যে, খুলনা-যশোর অঞ্চলে ভারতীয় সৈন্যদের যুদ্ধ-পরবর্তী লুটপাটের বিরোধিতা করার কারণে তাকে আটক করা হয়েছিল। খুলনার তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার কামাল সিদ্দিকী পরে লিখেছিলেন যে, জলিল খুলনায় অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং সম্পত্তি দখল সহ একাধিক ক্ষমতার অপব্যবহারের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ৭ জুলাই, ১৯৭২ সালে মুক্তি পান। রাজনৈতিক জীবনঃ জেল থেকে মুক্তি পেয়ে মেজর এম এ জলিল রাজনীতিতে যোগ দেন এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সভাপতি হন৷[২][২৪] ১৯৭৩ সালে তিনি সাতটি আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং সব কয়টিতে পরাজিত হন৷ ১৯৭৫ সালের ২৫ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের সাথে গ্রেফতার হন, বিচারে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। ১৯৮০ সালে ২৪ মার্চ মুক্তি লাভ করেন। এছাড়া তিনি ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন৷ ১৯৮৪ সালে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন৷ পরবর্তীকালে তিনি জাসদ ত্যাগ করে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন নামে একটি দল গঠন করেন৷[২][১০] ১৯৮৪ সালের ২১ অক্টোবর তিনি আমীরে শরীয়ত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী (রহ) এর নেতৃত্বে গঠিত সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদে যোগ দেন। ২৬ অক্টোবর পরিষদের দেশব্যাপী দুআ দিবস ও বায়তুল মুকাররম মসজিদ চত্বরে সমাবেশে তিনি মাওলানা হাফেজ্জীর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেন৷ মৃত্যুঃ ১৯৮৯ সালের ১৯ নভেম্বর রাত ১০টা ৩০ মিনিটে তিনি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মৃত্যুবরণ করেন৷ পরে ২২ নভেম্বর তার মৃতদেহ ঢাকায় আনা হয় এবং সামরিক মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’-এ ভূষিত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম এ জলিল।

এম হামিদুল্লাহ খান বীর প্রতীক

এম হামিদুল্লাহ খান বীর প্রতীক

শৈশবকালঃ ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৮ সালে এম হামিদুল্লাহ খানের জন্ম হয় তৎকালীন ইংরেজ শাসন কালে বিক্রমপুর পরগণায় লৌহজং থানার (র্বতমান মুন্সীগঞ্জে) পদ্মার নদীর নিকটে উত্তর মেদিনী মণ্ডল গ্রামে তার দাদা জমিদার "খান বাহাদুর" মোহাম্মদ আজিম খান এর খাঁন বাড়িতে। বাবা ইম্পিরিয়াল ফরেস্ট সাৰ্ভিস এর বেঙ্গল ফরেস্ট ডিপাৰ্টমেণ্টে ফরেস্ট অফিসার(ডেপুটি রেন্জার)- এম দবিরউদ্দিন খান এবং মা - জসিমুন্নেসা খানের নয় সন্তানের মধ্যে তার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। পিতার চাকুরিজনিত কারণে তিনি বিভিন্ন জায়গায় পড়াশোনা করেছিলেন।[২] তিনি আসামের গৌহাটীতে এঙগ্লো-বাংলাদেশ সিলভার জুবলী স্কুল এবং রাঙ্গামাটি ক্যাথলিক মিশনারি স্কুলে লেখাপড়া করেন। সে স্কুলেই সৰ্বপ্ৰথম তার ইংরেজি ভাষা শেখা ও চৰ্চা হয়। তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৫৪ সালে লৌহজং এ. টি. ইনস্টিটিউশন(কাজীর পাগলা) থেকে। এরপর তিনি ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে এবং এ কলেজ থেকেই ১৯৫৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। জগন্নাথ কলেজে ব্যাচেলর অফ কমার্স কোর্সে দুই বছর অধ্যয়ন করে আইন বিভাগে ভৰ্তি হয়েও তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীর কমিশনপ্ৰাপ্ত চাকুরির চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে অনুমোদিত হন। পাকিস্তান বিমান বাহিনী একাডেমী রিসালপুরে তিনি ৩৪তম জিডি(পি) ১নং স্কোডরণ কোর্সে যোগদান করেন জুলাই মাসের ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে। এখানে দুই বছর প্রশিক্ষণ শেষে কমিশনপ্রাপ্ত হন(১৯৬২ সালের জুনে)। পরবৰ্তীতে তিনি জিডি প্ৰশাসনিক শাখায়(নিরাপত্তা ও তদন্ত) বদলি হন। কর্মজীবনঃ ১৯৬০ সালে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে জিডি পাইলট কোর্সে কমিশনপ্ৰাপ্ত হন। পরে তিনি প্রশাসনিক শাখায় নিয়োগপ্ৰাপ্ত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধের কিছু পূর্বে ১৯৭০ সালের শেষাৰ্ধে তিনি ঢাকা বিমান ঘাঁটিতে ৫নং (প্ৰভোস্ট এন্ড সিকিউরিটি) ইউনিটের কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব সহ তেজগাঁও আন্তৰ্জাতিক বিমান বন্দরে পদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিযুক্ত হন।[২] ১৯৭২-১৯৭৮ স্কোয়াড্ৰণ লীডার ও উইং কমান্ডার হিসেবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন তিনি। তিনি বিমান বাহিনীতে প্ৰভোস্ট মাৰ্শাল ও গ্ৰাউন্ড ডিফেন্স কমান্ডার নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৭৭ শনে তিনি উপ সামরিক আইন প্ৰশাসক হিসেবে মাৰ্শাল ল কমিউনিকেশন এন্ড কন্ট্ৰলের পরিচালক ছিলেন। তিনি মোট ২১ বৎসর চাকুরি করেন। বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সি-ইন-সি কৰ্ণেল ওসমানী তাকে যুদ্ধ ময়দানে স্কোয়াড্রন লিডার পদে পদোন্নতি দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণঃ মূল নিবন্ধ: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে এম হামিদুল্লাহ খান পাকিস্তান বিমান বাহিনী ঘাঁটি ঢাকার সহকারী প্রভোস্ট মার্শাল ও তেজগাঁও আন্তৰ্জাতিক বিমান বন্দরে (নিরাপত্তা দায়িত্ব) হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ২৫ শে মার্চের রাত্রে গণহত্যা শুরু হলে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণা অনুভব করেন। এ সময় কবি বেগম সুফিয়া কামালের বাসায় তার যাতায়াত ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি ৩টি পদে দ্বিতীয় পালন করেন। সর্বপ্রথম প্রবাসী সরকার তাকে বিহারের চাকুলিয়ায় সর্ববৃহৎ গেরিলা ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রবাসী সরকারের সামরিক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন। অতঃপর স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কৰ্নেল এম এ জি ওসমানী তাকে উত্তর ফ্রন্টে নিযুক্ত করেন যা ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তেলঢালায় মেজর জিয়া রহমানের কমান্ডাধীন ১১ নং সেক্টরের উপ সেক্টর অধিনায়ক হিসেবে। হেডকোয়ার্টারে রিপোর্ট করার পর মেজর জিয়া তাকে বৃহত্তর রংপুর ও ময়মনসিংহ জেলার বিপরীতে মেঘালয়ের নদীবন্দরে স্থাপিত মানকাচর প্রথম সাব সেক্টরের অধিনায়ক নিযুক্ত করেন। হামিদুল্লাহ খান ঐ ঘাঁটি থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডি-ডের প্রেক্ষাপটে চিলমারী উভচর অভিযান সহ রংপুরের উলিপুর,কোদালকাটি, ছালিয়াপাড়া, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা সহ বহু এলাকায় অবস্থিত পাকিস্তান বাহিনীর ঘাটিতেঁ অভিযান পরিচালনা করেন। রৌমারি ও রাজিবপুর থানাধীন ৫৫০ বর্গমাইল মুক্ত এরাকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাকে প্রদান করা হয়। অতঃপর ১১ নং সেক্টর এবং জেডফোর্সের অধিনায়ক মেজর জিয়ার রহমান তাকে ১১ নম্বর সেক্টরে 'উপ সেক্টর কমান্ডার' নিযুক্ত করেন। ১০ই অক্টোবরে মেজর জিয়াউর রহমান নিযুক্ত মহেন্দ্ৰগন্জে ২ উপ সেক্টর কমঃ মেজর আবু তাহের কে সেক্টরের দায়িত্ব দিয়ে যান। তাহের আহত হলে এম হামিদুল্লাহ ১৯৭১-এর ৩ নভেম্বর থেকে সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি পাক সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রবাসী সরকারে বাংলাদেশ ফোর্সেস সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী এম এ জি ওসমানী তাকে সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যাটেল ফিল্ড প্রমোশন দিয়ে স্কোয়াড্রন লীডার পদে উন্নীত করে। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন তিনি।[৪] মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ ও সবিশেষ অবদান রাখায় তিনি বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত হন।

মেজর নাজমুল হক

মেজর নাজমুল হক

জন্ম এবং জীবনঃ মেজর নাজমুল হক ১৯৩৮ সালের ১ আগস্ট চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার তৎকালীন সাতকানিয়া উপজেলার অন্তর্গত আমিরাবাদ ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা অ্যাডভোকেট হাফেজ আহমদ, মা জয়নাব বেগম। তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে কুমিল্লার পেশোয়ারা পাঠশালা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ই যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে।[৩] ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ অক্টোবর আর্টিলারী কোরে কমিশন লাভ করেন।[২][৪] মুক্তিযুদ্ধে অবদানঃ মুক্তিযুদ্ধের সময় নাজমুল হক পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে মেজর পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি রাজশাহী জেলা, পাবনা জেলা, বগুড়া জেলা এবং দিনাজপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গড়ে ওঠা ৭ নং সেক্টরের কমান্ডার পদে ১৯৭১ এর এপ্রিল থেকে অগাস্ট মাস পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। তরংগপুর ছিল তার হেডকোয়ার্টার। তার সেক্টরে তিনি গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করতেন এবং মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতেন যারা প্রথাগত সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলো না। প্রায় পনের হাজার মুক্তিযোদ্ধা এ সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর তার অধীনেই যুদ্ধ করেন। ১৮ মার্চ, ১৯৭১ তারিখে মেজর নাজমুল হককে নওগাঁয় ৭ ইপিআর উইংয়ের অধিনায়ক করে পাঠানো হয়। ২৫ মার্চ, ১৯৭১ এ পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর অপারেশন সার্চলাইট শুরু হলে পরদিন স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে নওগাঁ মহকুমাকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলার অংশ ঘোষণা করেন তিনি। স্থানীয় যুবকদের হাতে তিনি তুলে দেন অস্ত্র। স্বেচ্ছাসেবক যুবকদের নিয়ে গঠন করেন ইপিআর মুজাহিদ বাহিনী। সেই বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে প্রথমেই তিনি নওগাঁ ও বগুড়ার পাকিস্তানি হানাদারদের ক্যাম্প দখল করে শত্রুমুক্ত করেন গোটা বগুড়া জেলা। ২৮ মার্চ, ১৯৭১ তারিখে তার বাহিনীর দ্বিমুখী আক্রমণে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে হানাদাররা। দিনাজপুরের ধনধনিয়াপাড়ায় ১৮ জুন, ১৯৭১ তারিখে বড় রকমের এক যুদ্ধের পর ওই এলাকা মেজর নাজমুলের বাহিনীর দখলে আসে। এতে ১৪ জন পাকিস্তানি সেনা মারা যায়।

মেজর এম এ মনজুর বীর উত্তম

মেজর এম এ মনজুর বীর উত্তম

জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ এম এ মঞ্জুর ১৯৪০ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানার গুপিনাথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস নোয়াখালী জেলার চাটখিল থানার কামালপুর গ্রামে। অন্যান্য ভাই-বোনদের মতো ছোটবেলা থেকেই এম এ মঞ্জুর ছিলেন মেধাবী। তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় কলকাতায়। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকায় এসে আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাঞ্জাবের সারগোদা পাবলিক স্কুল থেকে সিনিয়র ক্যাম্বিজ এবং ১৯৫৬ সালে আইএসসি পাস করেন। কর্মজীবনঃ এম এ মঞ্জুর ১৯৫৭ সালে তিনি কাকুল সামরিক একাডেমিতে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমি থেকে কমিশন লাভ করেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় সিএসএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিএসপি অফিসার হয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে কানাডার স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কমিশন্ড পদে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানে আটক অনেক বাঙালি অফিসার যুদ্ধে যোগদানের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এসময় এম এ মঞ্জুর শিয়ালকোটে 'ব্রিগেড মেজর' হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিযুক্ত ছিলেন শিয়ালকোটের চতুর্দশ প্যারা ব্রিগেডে। ২৬ জুলাই রাত আটটার দিকে পরিবারসহ এবং আরদালি আলমগীরসহ অন্যরা পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। ২৭ জুলাই এই দলটি দিল্লি পৌঁছে। ৭ আগস্ট এম এ মঞ্জুর মুজিবনগর পৌঁছেন। ১১ আগস্ট মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ৮নং সেক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়।[৩] ৮নং সেক্টরের আওতায় ছিল কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা। পরে বরিশাল ও পটুয়াখালীকে এই সেক্টর থেকে বাদ দেয়া হয়। এই সেক্টরে কুষ্টিয়ার উত্তর থেকে খুলনার দক্ষিণাংশ পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ মাইল সীমান্ত ছিল। সেক্টরের সৈন্য সংখ্যা ছিল দুই হাজার। গেরিলা বাহিনীর সদস্য ছিল প্রায় সাত হাজার। সাতটি সাব-সেক্টরের সমন্বয়ে গঠিত এই সেক্টরের সদরদপ্তর বেনাপোলে থাকলেও কার্যত সদরদপ্তরের একটা বিরাট অংশ ভারতের কল্যাণী শহরে ছিল।

×
সেক্টর কমান্ডার